Sep 9, 2016

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের লাভটা কী?

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের লাভটা কী? 
মাত্র এ বছরের শুরুর দিককার খবর- গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ পাওয়া গিয়েছে। ধরে বেধে বলে কয়ে বোঝাতে হবে না এটা যে তাত্ত্বিক আবিষ্কারের একটা প্রমাণ মাত্র। যেহেতু এর ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নাই, অতএব সবাইকে বলে দেবার মত লাভের বিবৃতি আমাদের কাছে নেই। গেল বছর হিগস বোসন কণা পেয়ে গেলাম আমরা, নিউট্রিনোর ভর আছে সে প্রমাণ দিয়ে দিলাম- সবই তো তাত্ত্বিক। কী লাভ?

একশ বছর আগে ফিরে যাই। সারা জাগানিয়া আপেক্ষিক তত্ত্ব, আইনস্টাইন যার কারণে সবচেয়ে বেশি স্মরিত সেজন্য তাকে নোবেলই দেয়া হল না। ১৯২১ এর আগেও কিন্তু আইনস্টাইন নোবেলের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন কিন্তু জয় পাননি। কারণ, তখন এই তত্ত্বের লাভ জানা ছিল না। তত্ত্বের লাভ জানা কিন্তু আসলেই গুরুত্বপূর্ণ, লাভ ছাড়া একটা জিনিসের অস্তিত্ব টিকে না। যে বিষয়টার লাভ যত বেশি আর বিস্তৃত সেটি তত স্থায়ী, প্রভাববিস্তারকারী। আমাদের বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ক্ষেত্রেও অমন কথা বলা চলে, তার বোস-আইন্সটাইন কন্ডেন্সেটের জন্য তিনি নোবেল না পেলেও তাঁর কাজের ওপর ভিত্তি করে করা কাজে নোবেল পেয়ে বসে আছেন পদার্থবিজ্ঞানীরা।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কথা বলি। এটাও একশ বছর আগের গল্প, কার্ল ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ আর আরভিন শর্ডিংগার যে তত্ত্বের জন্ম দিলেন তার ব্যবহারিক দিক সম্বন্ধে নিজেরাই ওয়াকিবহাল ছিলেন না। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে, আপনার পর্যবেক্ষণ পুরোটা কখনোই নিশ্চিত নয়, ফাঁক থাকবেই এর মাঝে। এটা কোনো বোধ, বিজ্ঞানযন্ত্রের সীমা নয় যে আমরা ভুল করব, বরং এর পদার্থবিজ্ঞানটাই এমন যে আমরা পুরোটা জানব না। নিজেদের তত্ত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদ্বয়ের অভিমত ছিল যে, তাঁরা কেবল প্রকৃতি কিভাবে কাজ করে, পরমাণুর জগৎটা কেমন তা বের করতেই এটা আবিষ্কার করেছেন, কৌতূহলের কারণে।

১৫০ বছর পেছাই। ১৮৬৪ তে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল যে তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ দিলেন , সেটা স্পষ্ট বলে দিল সব তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের বেগ আসলে সমান। আরেক কথায় বললে আলো আর তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলকে যখন জিজ্ঞেস করা হল এর লাভ কী? তিনি বললেন কোনো লাভ নেই। সমীকরণ। প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন।

কিন্তু ওপরের তত্ত্বগুলো একটিও হারিয়ে যায়নি। পৃথিবীকে আজকের পর্যায়ে আনতে এরা একের পর এক আরো সত্য আর দৃঢ় হয়ে আসন গেড়েছে। লাভ বরং শেষ হচ্ছে না। ম্যাক্সওয়েল যদি আজ এসে দেখতেন তাঁর তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে আমরা পৃথিবীটাকে কী করেছি নিজের অনুমানকেও বিশ্বাস করতেন না।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স হচ্ছে আজকের ইলেকট্রনিক্সের প্রথম নিয়ামক। সেমিকন্ডাকটর, কম্পিউটার , মোবাইল ইত্যাদির পিছনে কাজ করছে এর বিজ্ঞান। ইলেকট্রনকে ব্যবহার করে আমরা যা যা তৈরী করেছি তার জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে জানতে হয়েছে। পরমাণুর আচরণ না জানলে আজ হয়ত ভ্যাকুয়াম টিউবের কম্পিউটারে বসে ঘাম ঝরাতে হত।

আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি মহাকর্ষকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দেখতে সাহায্য করেছে। স্থান-কালের বক্রতার ধারণাটুকু না থাকলে আজ কৃত্রিম উপগ্রহকে আবিষ্কার করতে পারতাম না। জিপিএস, কৃত্রিম উপগ্রহ, টেলিকমিউনিকেশনের জন্য যে সূক্ষ্ম হিসেবটা লাগে তা আপেক্ষিকতা তত্ত্বের। ওটা ছাড়া সব গোলমেলে হয়ে পড়বে।

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার লর্ড কেলভিন যখন বলেছিলেন, বিজ্ঞানের সব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়ে গেছে ঠিক তার পরপরই যেন আরেকটা বিপ্লব ঘটে গেল। কেলভিন ভুল প্রমাণিত হলেন বারবার। আপেক্ষিকতা, তেজস্ক্রিয়তা, নিউক্লিয়ার বল, পরমাণুর গঠন, হাবলের সূত্র, ব্ল্যাক হোল, সিংগুলারিটি, স্ট্রিং থিওরি, হিগস বোসন, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ... একের পর এক আবিষ্কার চলছেই। একটা আবিষ্কার আরো দশটা আবিষ্কারের মূলধন হিসেবে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।

সবই তো তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান।
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের যাত্রা কখনো থামবে না। এমন নয় যে আমরা সবকিছু আবিষ্কার করে ফেলব। বরং এ ব্যাপারটির পদার্থবিজ্ঞানটাই এমন যে আমরা ক্রমাগত অনাবিষ্কৃত জগতের দিক আবিষ্কার করতে থাকব। একটি চলমান প্রক্রিয়া।